Home শিক্ষা কোন দিকে যাচ্ছে এ দেশের শিক্ষা ব্যাবস্থা?
শিক্ষা - May 23, 2019

কোন দিকে যাচ্ছে এ দেশের শিক্ষা ব্যাবস্থা?

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফী হলো সবচেয়ে কম আলোচিত একটি বিষয়। অথচ এটিই সবচেয়ে বেশি আলোচনাযোগ্য একটি বিষয় হওয়া উচিত। আজকের আলোচনাটা করব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে উদাহরণ হিসাবে ধরে। ১৯২১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মের কিছুদিন পর যেই টিউশন ফী ধার্য্য করা হয়েছিল আমার ধারণা সেটিই আজ পর্যন্ত বলবৎ আছে। দুয়েকবার পরিবর্তন হলেও সেটি হয়েছিল সেই জন্মের শুরুর দিকে। আমি নিশ্চিত কয়েক যুগ ধরে এই টিউশন ফীতে হাত দেওয়া হয়নি। শেষবার যখন এই টিউশন ফী ঠিক করা হয় সেটি যদি ডলারে নির্ধারিত হতো তাহলেও আজ ১০০০ টাকার কম হতো না। ইনফ্লেশন বা ডলারের মান বিবেচনায় বলা যায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফী দিনে দিনে কমেছে। সম্ভবত পৃথিবীর কোথাও এটি ঘটেনি।

Web content writing training Online

আমাদের প্রশাসন যারা চালায় তারা এই জায়গাতে হাত দিতে সব সময়ই ভয় পায় ফলে এটিকে এড়িয়ে গেছে। প্রতিবছর ডলার আর দ্রব্যমূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটু একটু করে বাড়ালে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা এত করুন হতো না। একটি বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে হলে বিপুল অংকের টাকার প্রয়োজন। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বাড়াতে হলে এর জন্য বিরাট বাজেটের কোন বিকল্প নেই। উন্নত বিশ্বের আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাজেটের টাকার কয়েকটি উৎস থাকে। ১. সরকারি অনুদান, ২. অ্যালুমনাইদের কাছ থেকে অনুদান ৩. ইন্ডাস্ট্রির সাথে বিভিন্ন গবেষণা চুক্তি থেকে অর্থ প্রাপ্তি ৪. ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফী থেকে অর্থ আয়, ৫. ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনুদান। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষ করে চলে সরকারি অনুদান এবং সামান্য যা কিছু আয় হয় টিউশন ফী থেকে তা দিয়ে। এইসব মিলিয়ে যা পাওয়া যায় তা দিয়ে শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন এবং অন্যান্য আনুসাঙ্গিক খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ঠ!

স্মরণ করিয়ে দেই যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গত অর্থ বছরের বাজেট ছিল ২.২৩৭ বিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ছিল খুব সম্ভবত ৬০০-৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রায় ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের সমপরিমাণ বাজেট কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট। আর আমাদের সরকার ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ রেখেছে। একদিকে টিউশন ফী যেমন হাইস্যকর তেমনি সরকারি বাজেট বরাদ্দ হাইস্যকর। এইগুলা শিক্ষার সাথে রসিকতা করার সামিল। অর্থের অনটনের কারণেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নানারকম অনাচার পরিলক্ষিত হয় এইগুলোর একটি হলো ইভনিং বা সান্ধ্যকালীন কোর্স। সরকার যদি এনাফ বাজেট দিত আমি নিশ্চিত এইসব অনাচারের অনেক কিছুই বন্ধ হতো। আরো একটি অনাচার হলো শিক্ষকরা সবসময় কিছু অতিরিক্ত অর্থ আয়ের পথ খুঁজে। পর্যাপ্ত বেতন দিলে এইসব অনাচারও কমে আসতো বলে আমার বিশ্বাস। অর্থের অভাব অনেক অন্যায় এবং অনাচারের কারণ।

অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফী আবার অনেক উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বেশি। তারা যে এত বেশি টিউশন ফী দিয়ে পড়ছে আমাদের কারো সেইদিকে নজর নেই। কেন? ওখানে যারা পড়ছে তারা কি এই দেশের সন্তান না? তাহলে জাস্ট একটি ভর্তি পরীক্ষায় একটু ভালো করতে পারলো না বলে তাদের এত বড় খেসারত দিতে হবে কেন? এই দুইয়ের একটি সমন্বয় থাকা একান্তই উচিত।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ে তাদের অনেকেই ধনাঢ্য পরিবারের। তারা কেন আমার দেশের গরিব বাবামায়েদের সন্তানদের সমান টিউশন ফী দিবে? এটা কি ফেয়ার? টিউশন নির্ধারণ হতে পারে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার উপর নির্ভর করে। ধনীদের কাছ থেকে বড় অংকের টিউশন ফী নিয়ে এর একটি অংশ গরিব ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। অনেকের জন্য টিউশন ফী মৌকুফ হতে পারে। সকলকে সমান ভাবে মাপাও অন্যায়। এই অন্যায় আমরা যুগের পর যুগ ধরে করছি। এছাড়া আমরা প্রতি বিভাগে পাঁচ জন ছাত্রকে ভর্তি করতে পারি বড় অংকের ডোনেশনের মাধ্যম তবে ভর্তি পরীক্ষায় ন্যুনতম শর্ত পূরণ সাপেক্ষে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য একটি কোটা আছে। সেই কোটার নিয়ম ডোনেশনের মাধ্যমে ভর্তিচ্ছুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।

হার্ভার্ড এমআইটিতে এই পদ্ধতিতে আরবের শেখ ও অন্যান্য ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানরা ভর্তি হয়। এতে অন্য ছাত্রদেরও লাভ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টিতো শুধু লেখাপড়ার জন্যই না। এখানে লিংক এস্টাব্লিশড হয়। ধনী গরিব ক্ষমতাশালীদের মিশ্রনের পরিবেশ তৈরী করাও বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দায়িত্ব। আমি যখন ছাত্র ছিলাম তখনও লক্ষ করেছে আমাদের প্রতি ক্লাসে গ্রামের দরিদ্র, মধ্যবিত্ত ও শহরের মধ্যবিত্ত এবং ধনাঢ্যদের একটি সংমিশ্রণ ছিল। এখন যেহেতু ধনাঢ্য পরিবারের ছেলেমেয়েরা কেবল ইংরেজি মাধ্যমেই পড়ে তাদের পরিমান এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। এমনিতেই আমাদের সমাজটা অর্থবিত্তের ভিত্তিতে মারাত্মক বিভাজিত। যেমন একেবারে হতদরিদ্রের সন্তানরা কওমি মাদ্রাসায় যায়, গরিব ও নিম্নমধ্যবিত্তের সন্তানরা মাদ্রাসায় যায়, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের সন্তানরা বাংলা মাধ্যম কিংবা ভার্শনে যায় আর উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের সন্তানরা ইংরেজি মাধ্যমে যায়। এইরকম একটি বিভাজিত সমাজ কখনো কল্যাণকর হতে পারেনা। তাই এদের সকলের সন্তানদের কমন মিটিং প্লেসের জায়গা আমাদের তৈরী করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে সর্বোৎকৃষ্ট সেই জায়গা।

এই টিউশন ফী বাড়িয়ে যদি শিক্ষার মান বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া হয় সেটি শেষ বিচারে সকলের জন্য মঙ্গল নয়? এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের ন্যূনতম কোন সুযোগ দেওয়া হয়? আবাসিক হল যেন একেকটি বস্তি। আবার সেটিও অনেক ক্ষেত্রে অনেক ছাত্রের জন্য টর্চার সেলের মত। শিক্ষক হয়ে এইগুলো দেখা এবং সহ্য করা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। ক্যাম্পাসে খাওয়া দাওয়ার কি কোন উন্নত মানের আছে? ক্লাস রুমের অবস্থা, লাইব্রেরির অবস্থা, ল্যাবের অবস্থা কোন কিছুই ঠিক নেই। কারণ এইসব ঠিক করতে অর্থের প্রয়োজন। সেই অর্থের যোগান না দিয়ে যেনতেনভাবে চালানো মানে আমাদের সন্তানদের সাথে আমরা অন্যায় করছি। আমাদের উচিত বিদেশী ফ্যাকাল্টি নিয়োগ দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যখন ranking করা হয় তখন লোকাল ফরেন শিক্ষকের ratio খুবই গুরুত্বের সাথে দেখা হয় কারণ নিশ্চই আছে। কারণ এর সাথে শিক্ষা ও গবেষণার মানের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে।

আগামী কয়েকদিনের মাঝে নতুন বাজেট আসছে। আশা করছি এইবার শিক্ষায় জিডিপির ন্যুনতম ৫% বরাদ্দ দিয়ে সরকার প্রমান করবে যে তারা এই দেশকে ভালোবাসে এবং চায় এই দেশের ছেলেমেয়েরা শিক্ষায় দীক্ষায় বড় হয়ে দেশকে আরো দ্রুত গতিতে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

সোর্সঃইঞ্জিনিয়ার’স ডায়েরি

100% Free Domain Hosting - Dreamhost banner

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

চুড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষায় এবার নতুন নিয়ম। হোয়াটসঅ্যাপ ই-মেইলে প্রশ্ন,উত্তর দেওয়া যাবে ২৪ ঘন্টা

কলকাতা :  এক দিকে কোরোনার প্রকপ অন্য দিকে কোর্টের আদেশ। এই দুয়ের চাপে এবার কার্য়ত বই দেখেই…